নতুন বৌয়ের বেশভূষা যেরকম থাকে সেরকম কিছুই পারুলের মধ্যে নেই। হাতে মেহেদি নেই, পায়ে আলতা নেই, ঠোঁটে হাসি নেই। তবে সে বিয়ের পরও লুকিয়ে চুরিয়ে গাছে উঠে, যেদিকে ইচ্ছে হয় সেদিকে ঘুরতে বের হয়ে যায় এমনকি ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে অনায়াসে খেলতে বসে যায়। অবশ্য বিয়ের আগে বেশিরভাগ সময়েই বাবুলকে ওর সংগে দেখা যেত। ছোট থেকে ওরা একসাথে খেলত, খেলায় রাজা-রানী হত। ওদের সহপাঠীরা জানত, একদিন ওদের বিয়ে হবে। কিন্তু এখনকার সময়টা ভিন্ন। পারুলের সাথে বাবুলের সম্পর্কটা বিচিত্ররূপ নিয়েছে।
ওরা যে গ্রামে থাকে সে গ্রামটা বাংলাদেশের বরেন্দ্র এলাকায়, সাঁওতালের বাসই বেশি সেখানে, আইন কানুনের বালাই নেই বললেই চলে। তাই বাল্যবিবাহ সেখানে এমনকিছু ব্যাপার নয়। ওরা যখন ক্লাস এইটে তখন তাদের মধ্যে হঠাৎই বিচ্ছেদ ঘটে। সেসময় একনাগাড়ে তাদের দশ-বারদিন দেখা হল না। এর মাঝে একদিন তাদেরই এক সহপাঠি আনারুল বাবুলকে বলে,
-পারুলের নাকি বিহ্যা? শুন্যাছিস নাকি?
-হ্যামাকে রাজ্জাক্যা কহিল যে পারুলের বিহ্যা।
-চল রাজ্জাক্যার কাছে চল। মিছা কহিলে তোকে হ্যামি পুঁতে ফেলব এই কহ্যা দিলাম।
কিন্তু বাবুলের কথায় আনারুল রাজ্জাকের কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।
-কেনে যাবি নাবে?
-তুই যাগা, বাপে হ্যামাকে ক্ষ্যাতে ড্যাক্যাছে।
বাবুল তাই একাই রাজ্জাকের কাছে ছুটে যায়।
-তুই আনারুল্যাকে কি কহেছিস?
-হ্যামি, কই কিছু কহিনি তো।
-তুই নাকি কহেছিস, পারুলের নাকি বিহ্যা?
-ও, পারুলের বাপে হ্যামার বাপকে কহ্যাছে।
বাবুল আচমকা রাজ্জাকের গালে থাপ্পর বসিয়ে দেয়,
-শালা, মিছা কথা যদি হোয়্যা থাকে তো তোকে হ্যামি...
-তুই হ্যামাক মারলি কেনেবে শালা?
-ম্যারাছি, বেশি কর্যাছি।
-যা শালা, তোর পিরীত গ্যাছে গ্যা তো হ্যামাক মারিস কেনে?
এবার বাবুল রাজ্জাককে লাথি মারার জন্যে পা বাড়ায় কিন্তু রাজ্জাক সময় মত নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয় এবং বলে,
-শালা তোকে হ্যামি দেখ্যা নিব কহ্যা গ্যালাম।
বাবুলের চোখে পানি এসে যায়, অসহ্য যন্ত্রণা হয় বুকে যেন পাথর জমে আছে।
তার দুইদিন পরেই বাবুল পারুলকে দেখে ওদের বাড়ীতে বধূবেশে, তার মেজ চাচার বউ হিসেবে। এরপর সে অভিমানে টানা একমাস পারুলের সাথে কথা বলেনি। আজ হঠাৎই পারুল বাবুলকে একা পেয়ে পিছন থেকে হাত ধরে ফেলে,
-তুই হ্যামাকে এড়ায় চলিস কেনে?
বাবুল প্রথমে উত্তর দেয় না। পরে আস্তে আস্তে বলে,
-হাত ছাড়ি দে, হ্যামার হাত ধর্যাছিস কেনে?
-ধর্যাছি কেনে বুঝিস না? তুই কথা না কহিলে হ্যামার যে বুক পুড়ে।
-তোর বুক পুড়ে তো হ্যামার কি? বুক পুড়ে তো বিহ্যা করলি কেনে?
-বিষ তো হ্যামিই খ্যায়াছি। বাজানে তোর চাচার থ্যাক্যা বিশ হাজার ট্যাকা নিয়্যাছিল। শোধ দিতে পারেহ নাই তাই হ্যামাক দিয়্যা দিছে।
বাবুলের চোখ রক্তবর্ণ হয় উঠে।
-তখন হ্যামাক কহিতে পারলি না? হ্যামি দ্যাখতাম, দরকার হলি বাজানের ট্যাকা চুরি কর্যা তোকে ছাড়ি নিতাম। তুই হ্যামাক কহিলি না কেনেরে পারুল। তুই হ্যামার জীবনটা নষ্ট কর্যা দিছিস।
বাবুল উত্তেজনায় ডান পাটা দশ ইঞ্চি তুলে মাটিতে লাথি মারে। তারপর দুজনেই কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। চোখে চোখে কথা হয় যেন দুজনেই দুজনকে বলছে, “বিহ্যা হয়্যাছে তো কি হয়্যাছে, হ্যামি তো তোকেই ভালবাসি।“ ঠিক এসময়ই বাবুলের মা বাবুলকে ডাকে,
-হ্যামার হয়্যাছে যত জ্বালা, বাবুইল্যারে...হারামজাদাটা কই গ্যাল কহ্যা গেল না।
বাবুল তৎক্ষনাত পারুলের কাছ থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। সন্ধ্যার পরে রাতের ভাত খেয়ে চেরাগ নিয়ে বই খুলে পড়তে বসে সে। শহরের বিজলি এখনো এই গ্রামে এসে পৌঁছায় নাই। বাহিরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে চেরাগের আলো অদ্ভূত এক আলো ছায়ার খেলা সৃষ্টি করেছে। সেই আলোতে সে অংক খাতায় একটা মেয়ের মুখের অবয়ব আঁকার চেষ্টা করে। মেয়েটা পারুল কিনা চেনা যায় না তবু ছবিটার পাশে তীর চিহ্ন দিয়ে লিখে “লরুপা”, কিছুদিন ধরেই সে অংক খাতা আর স্কুলের দেয়ালে পারুলের নাম উলটো করে লিখে চলেছে, “লরুপা”।
এভাবেই দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল তাদের। হঠাৎ তাদের বাসায় আবার উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বাবুলের ছোট চাচার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। ওরা গরুর গাড়ীতে করে বউকে আনতে যায়। সবকিছুই ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হয় কিন্তু ফেরার পথে বিপত্তি ঘটে। ওরা যখন রওনা দিয়েছিল তখন ঝড়ের পূর্বাভাসও ছিল না। হঠাৎ কোথা থেকে ঝড় এসে পড়ে দিনের দুঘন্টা বাকি থাকতেই চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। বলদগুলো বাতাসের তোড়ে কিছুতেই সামনে যেতে দেয় না। গরুর গাড়ির উপরে যে ছাউনি ছিল তা ঝড়ের পাঁচ মিনিটের মাথায় উড়ে গেল। ওরা তখন আম বাগানের ভিতর, চারিদিকে শোঁ শোঁ শব্দে বুকে কাঁপন তুলে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। ওরা কিছুক্ষন একসাথে থাকার চেষ্টা করল তারপর ভয়ে সবাই ছুটোছুটি শুরু করলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাবুল কাছে যাকে পেল তার হাত ধরে ফেলল শক্ত করে, ঝড়ের মাঝেও বুঝতে পারল সেটা পারুলের হাত।
পরেরদিন গ্রামবাসি উপড়ে পড়া আম গাছের নিচ থেকে জোড়াজোড়ি করা দুইটি মৃতদেহ উদ্ধার করে। একটা বাবুলের এবং অন্যটা পারুলের। বাবুলের পকেটে একটা কাগজ পাওয়া গিয়েছিল যাতে অনেকবার লেখা ছিল “লরুপা”।
No comments:
Post a Comment